আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চিরনিদ্রায় সমাপ্তি
- আপডেট সময় : ০১:০১:৫৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬
- / ৩০২৯ বার পড়া হয়েছে
আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন এবং দেশের ইতিহাসের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত জটিলতা এবং বর্ণিল শারীরিক স্নেহের সাথে লড়াই করার পর, তিনি আজ রাতে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। হাজার হাজার নেতা, কর্মী এবং সাধারণ মানুষ বেসরকারি হাসপাতাল এভারকেয়ার এর সামনে এবং গুলশানে তার ‘ফিরোজা’র সামনে জড়ো হতে শুরু করে। তাদের প্রিয় নেত্রীকে শেষবারের মতো দেখতে আসা মানুষের আঘাতে সেখানকার বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক মহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।
শেষ মুহূর্তের দুঃখজনক মুহূর্ত
পরিবার এবং বেসরকারি হাসপাতালে সূত্রে জানা গেছে, আপোষহীন নেত্রী বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থার বেশ কিছুদিন ধরে অবনতি হচ্ছে। তিনি লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস এবং অন্যান্য জটিলতায় ভুগছিলেন। এই শরৎকাল থেকে তার শ্বাস-প্রশ্বাস বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তার হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী মেডিকেল বোর্ডের স্টাইলিশ ঘাম সত্ত্বেও
তাকে বাঁচানো যায়নি। মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল ৮০ গুণ। মৃত্যুর সময় তার ঘনিষ্ঠ পরিবারের সদস্যরা এবং দলের শীর্ষস্থানীয় কিছু নেতা বেসরকারি হাসপাতাল এভারকেয়ারে উপস্থিত ছিলেন।
গৃহিণী থেকে ‘রাজনীতিবিদ’ হয়ে ওঠা
আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান তুলনামূলকভাবে নাটকীয় ছিল। ১৯৪৫ সালে দিনাজপুরে জন্মগ্রহণকারী এই মহীয়সী মহিলা ১৯৬০ সালে একজন সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কেবল একজন শান্ত গৃহিণী হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। কিন্তু ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। দলের বাস্তবতা রক্ষার জন্য এবং কর্মীদের চাপের মুখে তিনি ১৯৮২ সালে বিএনপির হাল ধরেন।
আপোষহীন নেত্রী সেই সময় থেকে তিনি আর পিছনে ফিরে তাকাননি। ১৯৯০-এর দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর কঠোর ভূমিকার ফলে তিনি ‘দেশনেত্রী’ (আপোষহীন নেত্রী) উপাধি অর্জন করেছিলেন। তিনি ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করেন এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে, তিনি ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হয় এবং নারী শিক্ষার প্রসারে অকল্পনীয় সাফল্য অর্জিত হয়।
উত্থান-পতন এবং দীর্ঘ বন্দিদশা জীবন
আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন যেমন সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেছিল, তেমনি তাকে চরম প্রতিকূলতা এবং আত্মত্যাগেরও সম্মুখীন হতে হয়েছিল। বিশেষ করে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে, তাকে আইনি লড়াই এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। ২০১৮ সালে, মিথ্যা দুর্নীতির মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করে কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে নির্জন কারাবাস তার স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল।
পরবর্তীতে, সরকারের প্রশাসনিক আদেশে তাকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয় এবং তিনি তার গুলশানের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি ক্রমাগত বিদেশ যাওয়ার অনুমতি চেয়ে আবেদন করলেও আইনি জটিলতার কারণে তা সম্ভব হয়নি যা দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল।
শোকাহত রাজনৈতিক অঙ্গন এবং শোক বার্তা
রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী তারা আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। পৃথক শোক বার্তায় তারা বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও শিল্প সংগঠনের নেতারা তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন।
বিএনপি মহাসচিব এক বিবৃতিতে বলেছেন, “আমরা আমাদের অভিভাবক মুহূর্তটি হারিয়েছি। তিনি ছিলেন প্রজাতন্ত্রের একজন সজাগ অভিভাবক। তার অনুপস্থিতি কখনোই পূরণ করা যাবে না। দেশের মানুষের অধিকার অর্জনের জন্য তিনি যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।”
একটি যুগের অবসান
আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সাথে সাথে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বড় স্তম্ভ ভেঙে পড়ে। তিনি কেবল একটি দলের নেত্রীই ছিলেন না, বরং লক্ষ লক্ষ মানুষের অনুভূতি এবং বিশ্বাসের প্রতীকও ছিলেন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে, তিনি বহুবার কারারুদ্ধ ছিলেন, রাস্তাঘাটে লড়াই করেছিলেন কিন্তু কখনও মাথা নত করেননি এই ‘কঠোর’ ভাবমূর্তি তার সহকর্মীদের কাছ থেকে টুকরো টুকরো করে তুলেছিল।
দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনীতির সর্বোচ্চ পর্যায়ে তার শূন্যতা সকলের কাছে আলোচনার বিষয়বস্তু। তিনি তার উত্তরসূরিদের জন্য সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস রেখে গেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একজন প্রভাবশালী নারী নেতৃত্ব।








